সম্পাদকীয়
সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে বিভেদে অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক পক্ষরা

সংগৃহীত
রাজনীতিতে পক্ষ ও বিপক্ষ থাকবে। স্বভাবগত ভঙ্গিতে রাজনৈতিক আচরণ দিয়ে তারা জনতুষ্টি অর্জন করতে চাইবে। মোটা দাগে জনআকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে নিজের শক্তি সঞ্চয় করে তা মাঠে প্রয়োগ করবে রাজনৈতিক পক্ষগুলো। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এমন নজির হাতে গোনা হলেও নিদেনপক্ষে তার প্রয়োগ বিগত সময়ে ম্লান হয়েছে। চালু হয়েছে দম্ভের ও দমিত করার সংস্কৃতি; যা ভয়ানক এক সংকটে জাতিকে নিপতিত করেছে। চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর সেই দম্ভকে যেমন চূর্ণ করা হয়েছে, তেমনি নতুন নতুন সংকট তৈরি করছে ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক পক্ষগুলো। কেউবা সংকট সমাধানের পথ উত্থাপন করছেন; আবার অন্যপক্ষ সেটিকে ষড়যন্ত্র কিংবা বিশ্বাসঘাতকতা এমনকি এই সময়ের জন্য এমন পদক্ষেপ সময়োপযোগী নয় বলেও যুক্তি দাঁড় করছেন।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর মূলত তিনটি রাজনৈতিক শক্তি দেশের রাজনৈতিক সংস্কার ও নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। দলগুলো হলো বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি(এনসিপি)। এছাড়া আরও কয়েকটি ছোট রাজনৈতিক দল রয়েছে। আগামীর রাজনীতি কেমন হবে সেই পথরেখা নির্মাণে অভ্যুত্থানের সরকার সংস্কার সংক্রান্ত অনেকগুলো পদক্ষেপ নিয়েছে একটি কমিশনের মাধ্যমে; যাতে রাজনৈতিক পক্ষগুলোরও অংশগ্রহণ রয়েছে নিজ নিজ অবস্থান থেকে। দলগুলো তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিও দিয়েছে। তবে সবকিছুর সামারাইজ করে কমিশন সরকারকে সেই সুপারিশটি করেছে। তবে, আশ্চর্যজনক বিষয় হলো কমিশনের মাধ্যমে নেয়া পদক্ষেপগুলোকে এখন বিশ্বাসঘাতকতার পর্যায়ে বিবেচনা করছে বিএনপি। দলটির হাইকমান্ডের বক্তব্যে এমনটি ফুটে উঠছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী সরকারের পদক্ষেপের সমর্থন জানালেও নিজস্ব দাবি- পিআর পদ্ধতিতে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়টি থেকে সরেনি। দলটি দাবি আদায়ে রাজপথে নানা কর্মসূচিও পালন করছে।
দৃশ্যত দেশের মানুষের কাছে জুলাই অভ্যুত্থানের শক্তির সুরক্ষার জন্য ঘোষিত জুলাই সদদের আইনি ভিত্তি দেয়ার পক্ষে। এজন্য একটি গণভোট প্রয়োজন। যা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার আয়োজন করবে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে উপদেষ্টাদের বক্তব্যে অনুমেয়। তবে কখন সেই গণভোট আয়োজন করা হবে তা নিয়ে বিএনপি ও জামায়াত বিপরীতমুখী অবস্থানে রয়েছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দেয়া সুপারিশ অনুযায়ী আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোট হতে পারে কিংবা তার আগেও গণভোট আয়োজন করতে পারে সরকার। কিন্তু বিএনপি জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজনকে কোনোভাবে মেনে নিতে চাইছে না। দলটি এমন অভিযোগও তুলছে- যে অন্তর্বর্তী সরকার ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশন তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল শুক্রবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, মতপার্থক্য থাকলেও জুলাই সনদে তারা সই করেছেন। তবে প্রধান উপদেষ্টার কাছে পেশ করা কমিশনের সুপারিশে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট রাখা হয়নি। দলটি বলছে, তারা নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় গেলে সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য আবার তুলবেন। অন্যদিকে জামায়াত এমন অভিযোগকে সরকারের উপর অন্যায়ভাবে বিএনপি চাপ সৃষ্টি হিসেবে দেখছে। জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেছেন , ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে একমত হয়ে আমরা সবাই জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছি। সবকিছু পর্যালোচনা শেষে সবাই একমত হয়েছি, একটি সাংবিধানিক আদেশের মাধ্যমে জুলাই সনদকে গ্রহণ করা হবে এবং এটার ওপর একটা গণভোট হবে। গণভোটের পর যে নির্বাচন হবে, সেই নির্বাচনের সংসদের মাধ্যমে ২৭০ দিনে এটাকে সংবিধানে যুক্ত করা হবে। সবকিছু ঠিক, আমরাও রাজি, বিএনপিও রাজি। কিন্তু হঠাৎ করেই বিএনপি পল্টি নিয়েছে। তারা এত দিন ধরে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে থেকে জুলাই সনদে স্বাক্ষরের পর এখন বলছে, আমরা এটাকে মানি না। বিএনপি বর্তমানে অন্যায়ভাবে এই সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।’
জুলাই সদনের আইনি ভিত্তি দেয়ার জন্য জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট চায় অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে জন্ম নেয়া রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপিও)। কারণ, তাদের নিরাপত্তা ও দেশের রাজনৈতিক নতুন বন্দোবস্তের জন্য এটি অপরিহার্য বলে জামায়াত ও এনসিপি মনে করে। কারণ, সংস্কার ব্যতীত নির্বাচনের মধ্যদিয়ে নতুন সরকার আসলে নানা অজুহাতে এটিতে ভাটা পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে। গণভোট ও আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দুটোই ক্রশিয়াল দেশের স্থিতিশীলতা ও নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য। যদি কোনো কারণে এই নতুন বন্দোবস্ত বাস্তবায়ন করা না যায়- তাহলে ভবিষ্যতে নব্য ফ্যাসিবাদের উত্থানের আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ থাকবে না, বরং ফ্যাসিবাদ নিয়তিতে রূপ নেবে।
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী জামায়াতের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। বলেছেন, জামায়াত নিম্নকক্ষে পিআর ও গণভোটের দাবিতে আন্দোলন করে ভন্ডামি করছেন। তিনি দলটিকে ভন্ডামি বাদ দিতেও বলেন। তবে দেশের বৃহৎ একটি রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে ‘ভন্ডামি’ শব্দ চয়ন কতটা শালীন ও শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে তা নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। দলীয় শীর্ষ নেতৃত্বের স্তরের অবস্থান থেকে তার এমন শব্দচয়ন শিষ্টাচার পরিপন্থী, দাম্ভিকতার বহিঃপ্রকাশ বলেই মনে হয়। এদিকে দলটির নিবন্ধন দেয়ার জন্য নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে দলটিকে প্রতীক বরাদ্দ নিয়ে এখনো সমস্যার সমাধান হয়নি। তবে ৩০ অক্টোবর নির্বাচন কমিশন নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা-২০০৮ এর সংশোধন করে শাপলা কলি সহ চারটি প্রতীক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। তাতে ধারণা করা যায় এনসিপি শাপলা কলি প্রতীক হিসেবে পাচ্ছে।
নির্বাচনী মাঠে জামায়াত, বিএনপি ও এনসিপি প্রচারণা চালানোসহ নানা প্রস্তুতি নিচ্ছে। এক্ষেত্রে জামায়াত মাঠ গোছানোতে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছে। দলটি প্রার্থী চূড়ান্ত করে আসনিভিত্তিক বেশ কাজ করছে। মাঠে দলটির নারী কর্মীরাও কাজ করছে। তবে নোয়াখালীতে বিএনপির বাধার মুখে পড়াসহ হেনস্তার শিকারও হয়েছে দলটির নারী কর্মীরা। অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী এখনো চূড়ান্ত না হলেও প্রায় প্রতিটি আসনে একাধিক প্রার্থী তৎপড়তা চালাচ্ছে। তবে দলটির অন্তর্কোন্দল, দলীয় কর্মীদের হত্যা, মামলা ও গ্রুপিংয়ের কারণে শৃঙ্খলিত নয়। চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করলে এমন অবস্থার আরো অবিনতি হতে পারে। এনসিপিও নির্বাচনী মাঠ গোছানোর কাজ করছে। দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের কে কোন আসনে নির্বাচন করবে, তা প্রাথমিকভাবে ঠিক হয়েছে এবং সে অনুযায়ী কাজও চলছে বলে দৃশ্যমান। তবে এনসিপি কারো সাথে রাজনৈতিক জোট করবে কিনা তা এখনো নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানা গেছে। দলটিকে বিএনপি কাছে নেয়ার চেষ্টা করছে। যা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে থাকা কয়েকজন নেতার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে। এছাড়া নির্বাচনের মাঠে ভালো করার জন্য জামায়াতও চাইবে এনসিপি তাদের সাথেই জোট করুক। কারণ, অভ্যুত্থানের শক্তি ও অপেক্ষকৃত তরুণ নেতৃত্ব হিসেবে তরুণদের কাছে তাদের একটি আবেদনও আছে। জামায়াত ও বিএনপির সাথে এনিসিপির দূরত্ব নেই এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহর বক্তব্যে উঠে এসেছে। তবে তার বক্তব্যে একটি বার্তা স্পষ্ট যে সংস্কার প্রশ্নে সম্পর্ক ঠিক থাকবে কিনা তা নির্ভর করবে। সেদিক থেকে সংস্কার প্রশ্নে বিএনপি ও জামায়াত অনেক ক্ষেত্রে এনসিপির সাথে একমত হলেও বৈপিরত্যও রয়েছে। রাজনৈতিক দল হিসেবে তা থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে জাতীয় স্বার্থে তা হওয়া উচিৎ নয়। আগামী নির্বাচনকে ঘিরে যে শঙ্কা ও রাজনৈতিক দলগুলোর মুখোমুখি অবস্থা বিরাজ করছে তা যৌক্তিক পন্থায় নিরসন করতে হবে। কারণ, আগামীর নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য ফ্যাসিবাদের বিলোপই রাজনীতির মূলমন্ত্র হওয়া উচিৎ। কে বা কোন দল ক্ষমতায় যাবে তা জনগণকে নির্ধারণ করার সুযোগকে অবারিত করে দিতে হবে।





